নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম: নতুন মায়েদের যা জানা জরুরি

 মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই

ছবি: প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ খেলে শিশু সুস্থ থাকবে (ছবিটি প্রতীকী)

নবজাতকের জন্য মায়ের বুকের দুধই হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার। যত বিকল্পের কথাই ভাবুন না কেন, মায়ের দুধের সমকক্ষ কিছুই হতে পারে না। প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ খেলে শিশু থাকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুরক্ষিত।

তবে শিশু জন্মের পরপরই যদি দুধ খেতে না পারে, তখন পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং দ্রুত কৌটার দুধ বা ফর্মুলা মিল্ক খাওয়াতে শুরু করেন। মনে রাখবেন, কৌটার দুধ মূলত গরুর দুধ থেকে তৈরি, যা আপনার নবজাতকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। মায়ের বুকের দুধের জন্য একটু ধৈর্য ধরতে হয় এবং এ সময় মাকে মানসিকভাবে সাহস জোগানো সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ল্যাকটোজ ও শিশুর পাতলা পায়খানা: একটি প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেক সময় দেখা যায়, শিশু মায়ের দুধ খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সারা দিনে বেশ কয়েকবার নরম বা পাতলা পায়খানা করছে। তখন আত্মীয়স্বজন বা কখনো কখনো চিকিৎসকেরাও বলে বসেন, "মায়ের দুধ শিশুর সহ্য হচ্ছে না।" এরপর তাঁরা বুকের দুধ বন্ধ করে দেওয়ার ভুল পরামর্শ দেন।

আসল সত্য হলো, মায়ের দুধে প্রচুর পরিমাণে ল্যাকটোজ থাকে, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে। এই ল্যাকটোজের কারণেই শিশুর পায়খানা নরম হয়। এমনকি ২৪ ঘণ্টায় যদি শিশু একটু একটু করে ২৪ বারও পায়খানা করে, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক!

ছবি: শিশুকে দুধ খাওয়ানোর কিছু নিয়ম আছে

পজিশন ও অ্যাটাচমেন্ট: দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম

অনেক সময় দেখা যায়, শিশু মায়ের দুধ পাচ্ছে কিন্তু মুখে নিতে চাইছে না বা কান্নাকাটি করছে। আবার কখনো মায়ের স্তনের বোঁটা ফেটে গিয়ে দুধ খাওয়াতে গিয়ে মাকে তীব্র কষ্ট সহ্য করতে হয়। এর মূল কারণ হলো দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম না জানা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘পজিশন অ্যান্ড অ্যাটাচমেন্ট’ (Position and Attachment)।

  • সঠিক পজিশন (Position): মা শিশুকে এমনভাবে কোলে নেবেন যেন শিশুর মাথা মায়ের হাতের কনুইয়ের ওপর থাকে। পুরো হাত দিয়ে শিশুর শরীরে সাপোর্ট দিতে হবে। শিশুর শরীর সম্পূর্ণভাবে মায়ের দিকে ফেরানো থাকবে এবং শিশুর থুতনি মায়ের স্তন স্পর্শ করবে।

  • সঠিক অ্যাটাচমেন্ট (Attachment): অন্য হাত দিয়ে মা তাঁর স্তনকে সাপোর্ট দেবেন। স্তন ধরার সঠিক কৌশল হলো— ৪ আঙুল নিচে এবং বুড়ো আঙুল ওপরে থাকবে। এভাবে ধরলে স্তনের বোঁটা এবং তার চারপাশের কালো অংশ শিশুর মুখের ভেতর ঠিকমতো প্রবেশ করবে। এতে শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাবে এবং মায়ের স্তনের বোঁটা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।

    সফলভাবে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে চাইলে তাকে মায়ের সঙ্গে একই রুমে, একই বিছানায় রাখতে হবে

    নতুন মা-বাবার জন্য আরও কিছু জরুরি তথ্য

    সফলভাবে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে চাইলে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখবেন:

    • শিশুর ঘুম ও ক্ষুধা: জন্মের পর একটি শিশু দিনে প্রায় ২২ ঘণ্টাই ঘুমাতে পারে, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ঘুম থেকে জোর করে তুলে শিশুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না (এমনকি ২ ঘণ্টা পরপর খাওয়ানোর নিয়ম থাকলেও জোর করবেন না)। শিশু যখন ক্ষুধা অনুভব করবে, সে নিজেই হাত-পা নাড়বে বা মুখে আঙুল দেবে। তার এই ইশারা বুঝেই তাকে খেতে দিন।

    • শিশু কেন এত কাঁদে: শিশু কাঁদলেই মা-বাবা ভাবেন সে বোধ হয় দুধ পাচ্ছে না। মনে রাখবেন, শিশু যদি ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৬ বার প্রস্রাব করে, তবে ধরে নিতে হবে সে পর্যাপ্ত বুকের দুধ পাচ্ছে। কান্নার অন্য কোনো কারণ (যেমন: ডায়াপার ভেজা, পেটে গ্যাস) থাকতে পারে, সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন।

    • বোতলে বুকের দুধ নয়: অনেক মা বুকের দুধ পাম্প করে বের করে বোতলে (ফিডারে) খাওয়ান। ফিডার দিলে শিশু মায়ের বুকের দুধ টেনে খেতে অলসতা করে। আর শিশু মায়ের দুধ না টানলে ‘প্রোল্যাকটিন’ হরমোন নিঃসরণ কমে যায়, ফলে একসময় মায়ের বুকে দুধ শুকিয়ে যায়। মাকে যদি বাইরে যেতেই হয়, তবে দুধ বের করে কাপে রেখে যাবেন। মায়ের দুধ সাধারণ তাপমাত্রায় ৬ ঘণ্টা এবং রেফ্রিজারেটরে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে। প্রয়োজনে চামচ দিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।

    • মায়ের কাছেই রাখুন: বাড়ির মুরব্বিরা অনেক সময় মাকে বিশ্রামের সুযোগ দিতে শিশুকে অন্য রুমে রাখেন। কিন্তু শিশুকে অবশ্যই মায়ের সাথে একই রুমে, একই বিছানায় রাখতে হবে। এতে শিশু যখনই চাইবে, তখনই দুধ খেতে পারবে। মায়ের শরীরের উষ্ণতা ও সান্নিধ্যেই শিশু সবচেয়ে ভালো বেড়ে ওঠে।

      মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়—শিশুর জন্য নিরাপদ ঘুম, সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।


Post a Comment

Previous Post Next Post